ওমর ফারুকঃ বাংলাদেশে রেলওয়ে পরিবহন ব্যবস্থায় প্রান্তিক জনগণ ও মালামাল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । একসময় দেশের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে রেলপথই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নানা বাজেট সীমাবদ্ধতা অব্যবস্থাপনার, অনিয়ম ও লাগামহীন দুনীতির কারণে এই খাতটি কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি থেকে পিছিয়ে পড়েছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু সম্ভাবনাও আছে বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো অবকাঠামোগত দুর্বলতা। দেশের বেশিরভাগ রেললাইন এখনও সিঙ্গেল ট্র্যাক, যার ফলে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব ঘটে এবং সক্ষমতা কমে যায় কিছু দিন পর পর এক্সিডেন্ট ঘঠে। যেখানে মালেশিয়ার মত রাস্ট্র আজ থেকে ২০ বছর পুর্বে ইলেক্ট্রিক ট্রাকশানে চলে গেছে। এছাড়া মিটারগেজ ও ব্রডগেজের দ্বৈত ব্যবস্থা রেল পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি করে। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও রেল খাত অনেকাংশে পিছিয়ে। আধুনিক ইঞ্জিন, আধুনিক কারখানা, ট্রেনিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল টিকিট নিয়ন্ত্রণ, জিপি আর এস সিস্টেম এবং দ্রুতগতির ট্রেনের অভাব রেলসেবাকে ধীর ও অনির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। একইসঙ্গে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি রেলওয়ের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও দুর্নীতির অভিযোগও এই খাতের বড় একটি চ্যালেঞ্জ। প্রকল্প বাস্তবায়নে ইঞ্জিন ও ট্রাক একসাথে প্রকল্প না নেওয়া, বিলম্ব, ব্যয়ের বৃদ্ধি কারন এবং মানহীন কাজ অনেক সময় জনআস্থা কমিয়ে দেয়। এছাড়া দক্ষ জনবলের অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। যাত্রীসেবার সীমাবদ্ধতা রেলে যাত্রীসেবার মান এখনও সন্তোষজনক নয়। টিকিট পেতে ভোগান্তি, ট্রেনের বেশির ভাগ শিডিউল বিপর্যয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি যাত্রীদের নিরুৎসাহিত করে। ফলে অনেকেই সড়কপথকে বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়, যা রেলওয়ের ওপর চাপ কমানোর পরিবর্তে বরং তার গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত সব সীমাবদ্ধতার মাঝেও বাংলাদেশ রেলওয়ের সামনে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় রেলপথ হতে পারে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা। বর্তমানে সরকার রেল খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। নতুন রেললাইন নির্মাণ এ একয় সময়ে ইঞ্জিন ক্রয় এবং ডাবল লাইন প্রকল্প হাতে নেওয়া আধুনিক কোচ ও ইঞ্জিন সংযোজন— পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর ডাবল লাইন যেমন ময়মনসিংহ, সিলেট লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ। এসব উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কক্সবাজার রেলওয়ে সংযোগ হওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের- পুর্বাঞ্জল এর সাথে রেল নেটওয়ার্ক সঙ্গে যোগাযোগের নতুন গতি এসেছে। ভবিষ্যতে রেলপথে ইলেকট্রিফিকেশন, দ্রুতগতির ট্রেন চালু এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে এই খাত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। একইসঙ্গে পণ্য পরিবহনে রেলের ব্যবহার বাড়ানো গেলে সড়কের চাপ কমবে এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। করণীয় ও পথ নির্দেশনা বাংলাদেশ রেলওয়েকে আধুনিক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে— রেল অবকাঠামোর দ্রুত আধুনিকায়ন সম্পূর্ণ ডাবল লাইন নির্মাণ আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশন চালু দক্ষ জনবল তৈরি ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি দুর্নীতি রোধ এ শক্তি শালী অডিট কমিটি গঠনও সুশাসন নিশ্চিত করা বাংলাদেশ রেলওয়ে আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে রয়েছে উন্নয়নের বিশাল সম্ভাবনা। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে রেল খাত আবারও দেশের প্রধান পরিবহন মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সময়ের দাবি এখন একটাই—বাংলাদেশ রেলওয়েকে আধুনিক, দ্রুত ও জনবান্ধব সেবায় রূপান্তর করা।